নিউজ ডেস্ক,বিডিমিরর সেভেনটিওয়ান ডটকমঃ
গ্যাস সংকট সামাল দিতে গিয়ে বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের ব্যবহার বাড়িয়েছে। আগস্টে ডিজেল বিক্রি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২২ শতাংশ বেড়েছে। আসছে বোরো মৌসুমে সেচের জন্য ডিজেলের ওপর আরও চাপ তৈরি হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব ঘিরে আন্তর্জাতিক নৌপথে অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি পাওয়ায় সামনের দিনগুলোতে ডিজেল নিয়েও সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পণ্য সরবরাহ প্রায় বন্ধ। এর মধ্যে লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব ঘিরে নতুন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সৌদি আরবের তেল রপ্তানির একমাত্র লাইফলাইন এই বাব আল-মান্দেব। এটি হুতিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে বাড়তি দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে।
দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। গত বৃহস্পতিবার সরবরাহ ছিল প্রায় ২৩২ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাস থেকে ১৬২ কোটি এবং এলএনজি থেকে ৭০ কোটি ঘনফুট এসেছে। অথচ মহেশখালীর দুটি ভাসমান টার্মিনাল থেকে সর্বোচ্চ ১০৫ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ সম্ভব। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদনও কমছে। এলএনজি সরবরাহে এই ঘাটতির প্রভাব পড়ছে শিল্প, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের বাজারে।
চুক্তির বেশির ভাগ এলএনজি আসেনি
বাংলাদেশের সঙ্গে চার দেশের এলএনজি আমদানির আটটি চুক্তি রয়েছে। এসব চুক্তির আওতায় চলতি বছর ১০৩টি কার্গো দেশে পৌঁছানোর কথা ছিল। তবে বছরের প্রথম ৯ মাসে সরবরাহ পাওয়া গেছে মাত্র ২১টি। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ৮৬টি কার্গোর বিপরীতে আগস্ট পর্যন্ত এসেছে ১৩টি। আর স্বল্পমেয়াদি চুক্তির ১৭টি কার্গোর মধ্যে দেশে পৌঁছেছে মাত্র চারটি।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় আগামী নভেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত ৪৭টি কার্গোর সরবরাহ বাতিল হয়েছে। চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সরবরাহকারীরা এসব চালান পাঠাতে পারছে না। ফলে চুক্তিভিত্তিক সরবরাহের ঘাটতি সামাল দিতে স্পট মার্কেট ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তি থেকে এলএনজি কেনার ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হচ্ছে। একই কার্গো সংগ্রহে বাড়তি প্রতিযোগিতার কারণে আমদানির খরচও বেড়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের এলএনজি আমদানিতে কাতারের ওপর নির্ভরতা বেশ বেশি। গত বছর দেশে আসা মোট এলএনজির প্রায় ৭০ শতাংশই ছিল কাতার থেকে। আটটি চুক্তির ছয়টির সরবরাহের প্রধান উৎসও দেশটি। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশের এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থায় পড়েছে। এর সঙ্গে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা জ্বালানি পরিবহনের ঝুঁকিও বাড়িয়েছে।
বিশ্বের এলএনজি বাজারও সীমিত সংখ্যক উৎপাদনকারী দেশের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। বড় কোনো উৎপাদনকারী দেশে সরবরাহ সংকট দেখা দিলে বা গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে দীর্ঘ সময় পরিবহন ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির সরবরাহ কমে দাম বাড়তে পারে। এদিকে ইউরোপ ও এশিয়ার ক্রেতারা বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস সংগ্রহে সক্রিয় হওয়ায় একই কার্গো কেনার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতাও তীব্র হচ্ছে।
বাড়ছে ডিজেলের ব্যবহার
এলএনজি সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে জ্বালানি তেলের ওপর। গ্যাস না পেয়ে শিল্পকারখানাগুলো জেনারেটর ও বয়লারে ডিজেল ব্যবহার করছে। শিল্পের বয়লার ও তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে ফার্নেস অয়েলের ব্যবহারও বাড়ছে।
সরকারি তিন তেল বিপণন কোম্পানির আগস্টের বিক্রির হিসাবে এর চিত্র স্পষ্ট। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় পদ্মা অয়েলের ডিজেল বিক্রি বেড়েছে প্রায় ২৯ শতাংশ, মেঘনা পেট্রোলিয়ামের ২১ শতাংশ এবং যমুনা অয়েলের শিল্প গ্রাহকদের কাছে ৩৩ শতাংশ।
বিপিসির হিসাব অনুযায়ী, আগস্টে দেশে ডিজেল বিক্রি হয়েছে ৩ লাখ ৬০ হাজার টন। দৈনিক গড় বিক্রি প্রায় ১২ হাজার টন, যা গত বছরের আগস্টের দৈনিক গড়ের তুলনায় প্রায় ২২ শতাংশ বেশি। তেল বিপণন কোম্পানিগুলোর সূত্র বলছে, ৫০ শতাংশ কারখানা গত বছরের আগস্টের তুলনায় চলতি বছরের আগস্টে বাড়তি ডিজেল নিয়েছে।
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে ওষুধশিল্পেও। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের কারখানায় গ্যাস সংকটের আগে বয়লারে দৈনিক প্রায় ৫০০ লিটার এবং জেনারেটরে ১০ থেকে ১২ হাজার লিটার ডিজেল ব্যবহার করা হতো। সংকটের পর বয়লারে দৈনিক ডিজেলের ব্যবহার বেড়ে প্রায় ১০ হাজার লিটার এবং জেনারেটরে প্রায় ৫০ হাজার লিটারে উঠেছে। অর্থাৎ, কারখানাটিতে ডিজেলের দৈনিক চাহিদা প্রায় পাঁচ গুণ বেড়েছে। তবে চাহিদা বাড়লেও সরবরাহ মিলছে মাত্র ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ। সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত দুই মাসে প্রতি দফায় ৩৬ হাজার থেকে ৪৮ হাজার লিটার ডিজেল পাওয়া গেছে। পর্যাপ্ত জ্বালানি না পাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে জীবন রক্ষাকারী ওষুধের সরবরাহ ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।







