সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬ ৭:০৫ পূর্বাহ্ণ
■ ৩রা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

লাখো শিক্ষার্থীর ঝরে পড়ার নেপথ্যে স্কুলের বেআইনি সিদ্ধান্ত!

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Print

নিউজ ডেস্ক,বিডিমিরর সেভেনটিওয়ান ডটকমঃ

দুই বছর আগে নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত হয়েও এবার এসএসসি ও সমমানের ফরম পূরণের সময় প্রায় সাড়ে চার লাখের বেশি শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার নেপথ্যে ভয়ংকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। তাদের অনেকে পাশ করেছিল নির্বাচনি বা টেস্ট পরীক্ষায়। তবে নম্বর তুলনামূলক কম পাওয়ায় এসএসসি চূড়ান্ত ফরম পূরণের সুযোগ দেয়নি একশ্রেণির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ। জিপিএ-৫ ও পাশের সুনাম টিকিয়ে রাখতে অনেক নামিদামি প্রতিষ্ঠানও এই বেআইনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি টেস্ট পরীক্ষায় মাত্র একটি বিষয়ে ১০০-এর মধ্যে ৭০ নম্বর এবং বাকি সব বিষয়ে জিপিএ-৫ নম্বর পেয়েও চূড়ান্ত ফরম পূরণ করা থেকে বঞ্চিত হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কম নয়।

গত ১০ আগস্ট এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর এসব অভিযোগ সামনে আসে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে নড়েচড়ে বসেছে শিক্ষা বোর্ডগুলো। অনিয়মের সত্যতা খতিয়ে দেখতে ইতিমধ্যে অভিযুক্ত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে।

জানা গেছে, এবারের শতভাগ পাশ ৬৬৯ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক করবে বোর্ড। আর এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার্থীদের টেস্ট পরীক্ষার ফলাফল, রেজিস্ট্রেশন ও ফরম পূরণের যাবতীয় নথি যাচাই করা হবে।

আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান ইত্তেফাককে বলেন, নবম শ্রেণিতে নিবন্ধন করেও এসএসসি পরীক্ষায় বিপুল শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ না করার কারণ খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠানো হবে। তিনি বলেন, ৩১২ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবার একজন শিক্ষার্থীও কেন পাশ করেনি, তা জানতে কারণ দর্শানোর নোটিশ আজ রবিবার বোর্ড থেকে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানো শুরু হবে। এরপর শতভাগ পাশ ৬৬৯ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মতবিনিময় করা হবে। যারা এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেনি, তারা কোথায় গেছে, কেন পরীক্ষায় অংশ নিল না, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কোন অব্যবস্থাপনা ছিল না—সবকিছু খুঁজে বের করা হবে। প্রসঙ্গত, গত বছর শতভাগ পাশ করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৯৮৪টি। এসব প্রতিষ্ঠানের তথ্যও সংগ্রহ করা হচ্ছে।

১১ শিক্ষা বোর্ডের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে নবম শ্রেণিতে নিয়মিত পরীক্ষার্থী হিসেবে মোট ১৮ লাখ ৯৫ হাজার ৩৯৯ জন শিক্ষার্থী নিবন্ধন করেছিল। তবে এদের মধ্যে ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য শেষ পর্যন্ত ১৪ লাখ ৪৮ হাজার ৫১১ জন শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করে। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে নবমে নিবন্ধিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ২ লাখ ২৮ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করেনি। মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে বাকি প্রায় ২ লাখ ১৮ হাজার শিক্ষার্থী নবমে নিবন্ধিত হয়েও এসএসসির ফরম পূরণ করা থেকে বাদ পড়েছে। নির্বাচনি বা টেস্ট পরীক্ষা মূলত পাবলিক পরীক্ষার আগে শিক্ষার্থীদের নিজেদের প্রস্তুতি যাচাই ও অবস্থান বোঝার একটি অভ্যন্তরীণ মাধ্যম। তবে এ পরীক্ষায় কৃতকার্য হওয়া সত্ত্বেও কেবল কাঙ্ক্ষিত জিপিএ না পাওয়ায় মূল পরীক্ষার ফরম পূরণ করতে না দেওয়া শিক্ষা বোর্ডের নিয়মের স্পষ্ট পরিপন্থী।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের একজন কর্মকর্তা বলেন, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাদের ফলাফলের জৌলুস বাড়াতে টেস্ট পরীক্ষায় পাশ করা শিক্ষার্থীদের ওপর জিপিএর শর্ত চাপিয়ে বাদ দিতে পারে না। বোর্ডের পরীক্ষা পরিচালনা-সংক্রান্ত বিধান ও বাৎসরিক বিজ্ঞপ্তিতে নির্বাচনি পরীক্ষার দিকনির্দেশনা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে। কোনো শিক্ষার্থী এ প্লাস বা নির্দিষ্ট কোনো জিপিএ না পেলে ফরম পূরণ করতে পারবে না, এমন কোনো মনগড়া শর্ত জুড়ে দেওয়ার এক্তিয়ার প্রতিষ্ঠানের নেই। তবে কোনো শিক্ষার্থী যদি টেস্ট পরীক্ষায় কোনো বিষয়ে অকৃতকার্য হয় কিংবা বোর্ডের অন্যান্য আবশ্যক যোগ্যতা পূরণে ব্যর্থ হয়, সেক্ষেত্রে তাকে ফরম পূরণ থেকে বিরত রাখা যেতে পারে।

যত বেশি জিপিএ-৫, তত বেশি সুনামের প্রতিযোগিতা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের একজন অধ্যাপক বলেন, বাংলাদেশে দীর্ঘ দিন ধরেই বিদ্যালয়ের মান বিচারের প্রধান সূচক ধরা হয় পরীক্ষার ফলকে। কতজন জিপিএ-৫ পেল, পাশের হার কত কিংবা ভালো কলেজে কতজন সুযোগ পেল; অভিভাবকদের কাছে এসব পরিসংখ্যানই প্রতিষ্ঠানের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ। ফলে ভালো ফলের চাপ তৈরি হয় স্কুলের ওপরও। যত বেশি জিপিএ-৫, তত বেশি সুনাম; আর সুনাম বাড়লে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আগ্রহও বাড়ে। এ বছর সারা দেশে ৬৬৯টি প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষার্থী পাশ করেছে। তবে নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুলের মতো কিছু প্রতিষ্ঠান যেভাবে টেস্ট পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের একটি অংশকে মূল পরীক্ষায় বসা থেকে বিরত রেখেছে, তা শিক্ষার সাফল্য মূল্যায়নের প্রচলিত ধারণা নিয়ে নতুন করে ভাবার অবকাশ তৈরি করেছে। কারণ, জিপিএ-৫ আর প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষার এই তীব্র প্রতিযোগিতা অনেক সময় শিক্ষার আসল উদ্দেশ্যকেই আড়ালে ঠেলে দেয়। শিক্ষাবিদরা বলেন, একটি প্রতিষ্ঠানের ফলাফল প্রকাশের ক্ষেত্রে নবম শ্রেণিতে ভর্তি বা নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা, এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা, পাশের হার এবং জিপিএ-৫ পাওয়ার হার—সব তথ্য একসঙ্গে প্রকাশ করা উচিত। তাহলে অভিভাবকরা বুঝতে পারবেন, শতভাগ পাশের পেছনে প্রতিষ্ঠানটি কতজন শিক্ষার্থীকে নিয়ে কাজ করেছে। অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু বলেন, শুধু পাশের হার বা জিপিএ-৫ দিয়ে শিক্ষার মান নির্ধারণ করা উচিত নয়। এই প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীর মানসিক চাপও বাড়ছে।

নামিদামি যেসব স্কুলের শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়নি: নরসিংদী নাছিমা কাদির মোল্লা হাইস্কুলে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে নিবন্ধিত পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৬১৬ জন। এর বিপরীতে পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নেয় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ৩৭৬ জন এবং ব্যবসায় শিক্ষা শাখা থেকে ছয় জনসহ মোট ৩৮২ জন। অর্থাৎ ২৩৪ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি। রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুলে নিবন্ধিত শিক্ষার্থী ছিল ২ হাজার ১৩৪ জন। এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ২ হাজার ৭২ জন। এর মধ্যে ৭০ জন পরীক্ষা অংশ নিতে পারেনি। রাজধানীর মনিপুর স্কুলে নিবন্ধিত ছিল ৩ হাজার ৪৯০ জন। এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ৩ হাজার ৩৫৯ জন। পরীক্ষা দিতে পারেনি ১৩১ জন। মতিঝিল আইডিয়ালে নিবন্ধিত ২ হাজার ৭৭০ জনের বিপরীতে ফরম পূরণ করেছে ২ হাজার ৭২২ জন। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের কিছু নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বোর্ড পরীক্ষার আগে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের বাছাই প্রক্রিয়া চলে। টেস্ট পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর অপেক্ষাকৃত কম নম্বর বা জিপিএ পাওয়া শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের ডেকে বোর্ড পরীক্ষায় অংশগ্রহণের বিষয়ে নিরুত্সাহিত করা হয়। কোথাও কোথাও এসব শিক্ষার্থীকে অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে ফরম পূরণ করে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা বলা হয়।

খবরটি শেয়ার করতে নিচের বোতামগুলিতে ক্লিক করুন।

আরও খবর

বিভাগীয় সংবাদ