জুন ১৪, ২০২৬ ৯:৫১ অপরাহ্ণ
■ ৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ম্যাকবুক নিও ল্যাপটপ বাজারে নতুন ঝড়

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Print

টেক ডেস্ক ,বিডিমিররসেভেনটিওয়ানডটকম

কাগজে-কলমে ম্যাকবুক নিও-এর হার্ডওয়্যার তেমন আহামরি নয়। এতে আছে আইফোন ১৬ প্রো-এর প্রসেসর, ৮ জিবি র‌্যাম, ২৫৬ জিবি স্টোরেজ। অ্যালুমিনিয়াম চেসিসের মধ্যে বসানো হয়েছে সাড়ে তেরো ইঞ্চি ডিসপ্লে, ১২ ঘণ্টা ব্যাটারি লাইফ, কি-বোর্ডে ব্যাকলাইট নেই, মাত্র দুটি ইউএসবি সি পোর্টের একটির স্পিড সেই পুরনো ইউএসবি ২ স্ট্যান্ডার্ড। বাজারে আরো শক্তিশালী ল্যাপটপের অভাব নেই, ২০২৬ সালে এখন মাঝারি বাজেটের ফোনেও ৮ জিবি র‌্যাম অপ্রতুল মনে করে অনেক ক্রেতা।

এর পরও বাজারে আসার পর থেকে দেদার বিক্রি হচ্ছে ম্যাকবুক নিও। প্রযুক্তি অনুরাগী ও টেক ইউটিউবারদের উচ্ছ্বসিত পোস্ট ও ভিডিওতে সয়লাব ইন্টারনেট। অন্য ল্যাপটপ নির্মাতাদের যেন সরাসরি ধুরন্ধর সিনেমার ডায়ালগ দিচ্ছে অ্যাপল—‘ইউ আর নট রেডি ফর দিস’।

সঠিক দামে সঠিক হার্ডওয়্যার

অ্যাপল মানেই প্রিমিয়াম হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার হলেও, ম্যাকবুক নিও-এর দাম মাত্র ৫৯৯ ডলার।

বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৭৪ হাজার টাকা। ছাত্রদের জন্য আছে ১০০ ডলার ডিসকাউন্ট, তখন মূল্য ৪৯৯ ডলার বা ৬২ হাজার টাকার আশপাশে। যেহেতু অ্যাপল বাংলাদেশের বাজারে সরাসরি ব্যবসা করে না, ম্যাক কেনার জন্য ক্রেতাদের ভরসা রিসেলার। এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত দেশের বাজারে ম্যাকবুক নিও বিক্রি হচ্ছে বেশ চড়া দামে, ৮০ হাজার টাকার আশপাশে।

অপেক্ষাকৃত কম দামে বিক্রি হলেও ম্যাকবুক নিও-এর হার্ডওয়্যারের মান নিয়ে অ্যাপল কোনো কার্পণ্য করেনি। অ্যালুমিনিয়াম বডি, রেটিনা ডিসপ্লে, ফুল এইচডি ওয়েবক্যাম, উচ্চমানের স্পিকার ও মাইক্রোফোন, দেওয়া হয়েছে উচ্চমানের কি-বোর্ড ও ট্র্যাকপ্যাড। ল্যাপটপ বাজারে ৫০০ বা ৬০০ ডলার মূল্যে প্রিমিয়াম হার্ডওয়্যার ও ডিসপ্লেযুক্ত ল্যাপটপ নেই বললেই চলে। উইন্ডোজ ১১ এবং ক্রোমওএস নিয়ে ব্যবহারকারীদের অভিযোগের শেষ নেই। মাঝারি বাজেটে ম্যাকওএসযুক্ত নতুন ল্যাপটপ পাওয়া যাবে অনেকেই ভাবেনি, ঠিক সেটাই ভেবেছে অ্যাপল।

নিও-এর জনপ্রিয়তার পেছনে এটাও বড় কারণ।
এমন নয় যে ম্যাকবুক নিও একদম সবার জন্য সেরা ল্যাপটপ। কিন্তু নিও-এর জনপ্রিয়তার চাপে টিকে থাকার জন্য অন্য ল্যাপটপ নির্মাতাদেরও মাঝারি বাজেটে আরো উন্নত ল্যাপটপ আনতে হবে। এই প্রতিযোগিতায় দিনশেষে লাভবান হবে ক্রেতারাই।

পারফরম্যান্সের চমক

ম্যাকবুক নিও তৈরিতে ব্যবহৃত হয়েছে অ্যাপল এ১৮ প্রো সিস্টেম-অন-আ-চিপ। এতে আছে ৬ কোর সিপিইউ এবং ৫ কোর জিপিইউ। হার্ডওয়্যার ভিডিও ডিকোডার-এনকোডারের পাশাপাশি নিউরাল প্রসেসরও আছে এতে। খুবই কম বিদ্যুৎ খরচ করে শক্তিশালী পারফরম্যান্স দিতে পারে এটি। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, ৬০০ ডলার মূল্যের আর কোনো ল্যাপটপের সিপিইউ এর সিঙ্গেল কোর পারফরম্যান্স ম্যাকবুক নিও-এর সমকক্ষ নয়। মাঝারি মূল্যের ল্যাপটপের ক্রেতারা সাধারণত ইন্টারনেট ব্রাউজিং, ভিডিও দেখা, ডকুমেন্ট তৈরি, অনলাইন ক্লাস বা অফিসের কাজ আর অল্পবিস্তর কোডিং বা ছবি ও ভিডিও সম্পাদনার জন্যই সেটি ব্যবহার করে। এ ধরনের কাজে সিঙ্গেল কোর পারফরম্যান্স সবচেয়ে জরুরি। তাই বাজারের সবচেয়ে শক্তিশালী ল্যাপটপ না হলেও দৈনন্দিন ব্যবহারে ম্যাকবুক নিও-এর পারফরম্যান্সে বহু বছর পর্যন্ত সন্তুষ্ট থাকবে ব্যবহারকারীরা।

গেমিং, বড় সফটওয়্যার কমপাইল করা, এআই মডেল চালানো, উচ্চমানের ভিডিও এডিটিং বা ভার্চুয়াল মেশিন চালানোর মতো কাজের জন্য ম্যাকবুক নিও কাজের নয়। থান্ডারবোল্ট প্রযুক্তিও এতে দেওয়া হয়নি, তাই উচ্চগতির নেটওয়ার্কিং বা স্টোরেজ যোগ করারও উপায় নেই। তবে এই মূল্যের অন্যান্য ল্যাপটপেও এসব ফিচার সচরাচর দেওয়া হয় না।

যদিও গেমিংয়ের জন্য ম্যাকবুক নয়, এর পরও সাইবারপাংক ২০৭৭-এর মতো ভারী গ্রাফিকসের গেমও এটি চালাতে সক্ষম। শক্তিশালী গেমিং পিসি ছাড়া এটি খেলার উপায় ছিল না। এখন আইফোনের প্রসেসরযুক্ত ল্যাপটপে সেটি খেলা যাচ্ছে, সেটাই বিস্ময়কর।

ব্যাটারি লাইফেও ম্যাকবুক নিও পিছিয়ে নেই। অনায়াসে ১০-১২ ঘণ্টা কাজ করা যাবে। চার্জ করার জন্য ২০ বা ৩০ ওয়াটের ইউএসবি সি চার্জার বা পাওয়ার ব্যাংক যথেষ্ট।

মেমরি ও কুলিংয়ে ঘাটতি

ল্যাপটপটির র‌্যাম মাত্র ৮ জিবি। সিপিইউ, জিপিইউ এবং এনপিইউ মিলে সেটি ব্যবহার করে। ভারী কাজ করার জন্য ৮ জিবি মেমরি একেবারেই যথেষ্ট নয়। আধুনিক ওয়েবসাইটগুলো প্রচুর র‌্যাম ব্যবহার করে, ইউটিউবের একটি ট‌্যাবেই ব্যয় হয় ৩০০-৫০০ মেগাবাইট। সেই সুবাদে বলা যায় ৮ জিবি র‌্যামের ল্যাপটপ ৭৫-৮৫ হাজার টাকায় কেনার মানে নেই। বাস্তবতা এত সোজাসাপ্টা নয়। উইন্ডোজ ১১ নিজেই প্রচুর র‌্যাম ও প্রসেসিং ক্ষমতা ব্যবহার করে, যা ম্যাকওএস করে না। একই ধরনের কাজ করার জন্য তুলনামূলক কম র‌্যাম ব্যবহার করে ম্যাকওএস। তাই ৮ জিবি র‌্যামের জন্য ম্যাকবুক নিও পিছিয়ে থাকবে না।

নিও-এর মূল সমস্যা কুলিং। এতে কোনো ফ্যান নেই। গরম আবহাওয়ায় ভারী কাজ করলে ল্যাপটপটি দ্রুত গরম হয়ে পারফরম্যান্স কমে যায়। এ সমস্যা সহজে সমাধানও সম্ভব নয়। বলা যায়, ম্যাকবুক নিও-এর মূল সমস্যা র‌্যাম আর কুলিংয়ের ঘাটতি।

ম্যাকবুক নিও দিচ্ছে পরিবর্তনের ডাক

আইফোনের ডিজাইন যেমন বাজেট স্মার্টফোনের বাজারেও প্রভাব ফেলেছে, মাঝারি বাজেটের ল্যাপটপ বাজারও তেমনি ম্যাকবুক নিও-এর প্রভাবে বদলে যাবে। বাংলাদেশের বাজারে ম্যাকবুক নিও-এর দাম অনেক বেশি, তবু একই মূল্যে অন্যান্য ব্র্যান্ডের ল্যাপটপে সমকক্ষ ব্যাটারি লাইফ, ডিসপ্লে অথবা প্রসেসিং পারফরম্যান্স পাওয়া যাবে না। ম্যাকবুক নিও-এর আসল দাম, অর্থাৎ ৭২-৭৪ হাজার টাকা বাজেটের প্রায় সব ল্যাপটপেই থাকছে ৮ জিবি র‌্যাম ও ৫১২ জিবি স্টোরেজ। অর্থাৎ র‌্যাম বা স্টোরেজের সমালোচনাও খাটছে না। এই মূল্যের বেশির ভাগ ল্যাপটপের বডি প্লাস্টিকের তৈরি, ট্র্যাকপ্যাড ও স্পিকারের মান ম্যাকবুকের তুলনায় পিছিয়ে আছে। ডিসপ্লে ব্রাইটনেস, রেজল্যুশন এবং কালার অ্যাকুরেসিও ম্যাকের সমকক্ষ নয়। ব্যাটারি লাইফ ম্যাকের চেয়ে পিছিয়ে। তাই বাজার বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, ম্যাকবুক নিও-এর প্রভাবে ভবিষ্যতে মাঝারি বাজেটেও উচ্চ রেজল্যুশন ডিসপ্লে ও অ্যালুমিনিয়াম বডির ল্যাপটপের দেখা মিলবে। ব্যাটারি লাইফেও উন্নতির চেষ্টা করবে অন্য নির্মাতারা।

খবরটি শেয়ার করতে নিচের বোতামগুলিতে ক্লিক করুন।

আরও খবর

বিভাগীয় সংবাদ