সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬ ৫:২৬ পূর্বাহ্ণ
■ ৩রা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কমছে বৈদেশিক ঋণ, দায় শোধে চাপ

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Print

নিউজ ডেস্ক,বিডিমিরর সেভেনটিওয়ান ডটকমঃ

বাংলাদেশে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে নতুন বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতি ও অর্থছাড় ধারাবাহিকভাবে কমছে। কিন্তু আগের নেওয়া ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে।

পাঁচ বছর আগে যে পরিমাণ নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি মিলত, এখন তা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। অথচ একই সময়ে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের বার্ষিক ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। ফলে নতুন অর্থের প্রবাহ কমে যাওয়ার সময়েই পুরনো ঋণের দায় সামলাতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। এর সঙ্গে বিশ্বজুড়ে উন্নয়ন সহায়তা কমে যাওয়া, ঋণের সুদ ও শর্তে পরিবর্তন এবং আগামী কয়েক বছরে বড় অঙ্কের ঋণ পরিশোধের দায় যোগ হওয়ায় বৈদেশিক অর্থায়নে বাংলাদেশের জন্য কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) গত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যানেই এই পরিবর্তনের চিত্র স্পষ্ট। ২০২১-২২ অর্থবছরে বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী বাংলাদেশকে ১০.১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সেই প্রতিশ্রুতি নেমে এসেছে ৫.২৪ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে নতুন বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতি প্রায় অর্ধেকে নেমেছে।

একই সময়ে বাস্তবে পাওয়া ঋণের অর্থও কমেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বাংলাদেশ ১০.৯৭ বিলিয়ন ডলার পেয়েছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অর্থছাড় হয়েছে ৮.০৭ বিলিয়ন ডলার।
উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে ঋণ পরিশোধে। ২০২১-২২ অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণের কিস্তি ও সুদ বাবদ বাংলাদেশকে পরিশোধ করতে হয়েছিল দুই বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪.৪৯৪ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ পাঁচ বছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের বার্ষিক চাপ দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। নতুন ঋণ কমে যাওয়ার সময়ে পুরনো ঋণের দায় এভাবে বাড়তে থাকায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবস্থাপনায় চাপ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সামনের বছরগুলোতে এই চাপ আরো বাড়তে পারে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের হিসাবে, চলতি অর্থবছর থেকে ২০২৯-৩০ অর্থবছরের মধ্যে বাংলাদেশকে বৈদেশিক ঋণের কিস্তি ও সুদ বাবদ প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হবে। আগামী পাঁচ বছরে যে পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করতে হবে, তা স্বাধীনতার পর গত ৫৪ বছরে পরিশোধ করা প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। ফলে বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় সামনের বছরগুলো বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

এরই মধ্যে চলতি অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড়েও বড় পতন দেখা যাচ্ছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের হিসাবে, জুলাই-মে সময়ে বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড় হয়েছে ৪.৫৭৭ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই অর্থছাড় ছিল ৫.৪৮৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে অর্থছাড় কমেছে ১৮.৩ শতাংশ।

শুধু প্রকল্পের ঋণ নয়, বাজেট সহায়তার ক্ষেত্রেও বিদেশি অর্থের প্রবাহ কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ রেকর্ড ৩.৪৪ বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা পেয়েছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১.৫৬ বিলিয়ন ডলারে।

তবে অর্থছাড় কমলেও পাইপলাইনে থাকা বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বড়। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের হিসাবে বর্তমানে অর্থছাড়ের অপেক্ষায় রয়েছে ৪১.৭৩ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক ঋণ। এসব অর্থ দ্রুত ছাড় না হলে একদিকে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি কমতে পারে, অন্যদিকে প্রকল্পের অর্থায়নের জন্য নতুন করে ঋণের প্রয়োজনও বাড়তে পারে।

ঋণের পরিমাণের পাশাপাশি এখন বড় উদ্বেগ ঋণের খরচ নিয়েও। নমনীয় ও স্বল্প সুদের ঋণের অংশ কমে বাজারভিত্তিক পরিবর্তনশীল সুদের ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণ পোর্টফোলিওর প্রায় ৩০ শতাংশ ছিল পরিবর্তনশীল সুদের ঋণ। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সুদের হার বাড়লে এসব ঋণের পরিশোধ ব্যয়ও বাড়তে পারে। বৈশ্বিক আর্থিক বাজারের অস্থিরতার প্রভাব তাই সরাসরি বাংলাদেশের ঋণ ব্যবস্থাপনায় পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

এই পরিস্থিতির মধ্যে বাংলাদেশের ঋণমান নিয়েও সতর্কতা এসেছে। আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠান এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সার্বভৌম ঋণমানের পূর্বাভাস ‘স্থিতিশীল’ থেকে ‘নেতিবাচক’ করেছে।

বৈদেশিক ঋণের ঝুঁকি নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও তথ্য চেয়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সঙ্গে বৈঠকে সংস্থাটির প্রতিনিধিদল বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের ব্যয়, ঋণের ধরন, বাজারভিত্তিক পরিবর্তনশীল সুদের ঋণের ওপর নির্ভরতা এবং আগামী দিনের ঋণ পরিশোধের চাপ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চেয়েছে। এতে বোঝা যায়, বাংলাদেশের জন্য এখন শুধু কত ঋণ নেওয়া হচ্ছে তা নয়, কোন শর্তে ঋণ নেওয়া হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে তার ব্যয় কত হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বৈশ্বিক অর্থায়নের এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে স্বল্পোন্নত দেশগুলো। ওইসিডির হিসাবে এসব দেশ ১৩ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত উন্নয়ন সহায়তা হারাতে পারে। সাহারা মরুভূমির দক্ষিণাঞ্চলের আফ্রিকার দেশগুলোতে সহায়তা ১৬ থেকে ২৮ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। বিশেষ করে অনুদান ও স্বল্প সুদের ঋণভিত্তিক অর্থায়ন কমে যাওয়াই বড় উদ্বেগের বিষয়।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, বৈদেশিক ঋণ কমার পেছনে মূলত তিনটি কারণ রয়েছে—বিনিময় হারের পরিবর্তন, ঋণ পরিশোধ বৃদ্ধি এবং নতুন ঋণের নিট প্রবাহ কমে যাওয়া। নতুন ঋণের তুলনায় পরিশোধ বেশি হওয়ায় মোট ঋণের স্থিতিও কমেছে। মূলত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের পর নীতিগত ধারাবাহিকতা ও দৃশ্যমান সংস্কারের অপেক্ষায় রয়েছে উন্নয়ন সহযোগীরা, যা নতুন ঋণ চুক্তির পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরাও বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য সতর্কতার কথা বলছেন। অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রধান উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বৈশ্বিক উন্নয়ন অর্থায়নের কাঠামো মৌলিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উন্নত দেশগুলোর ঋণের চাপ, জনসংখ্যার বার্ধক্য ও প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির কারণে উন্নয়ন সহায়তার বাজেট কমছে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারি, খাদ্য নিরাপত্তা ও ডিজিটাল রূপান্তরের মতো নতুন চ্যালেঞ্জ অর্থায়নের অগ্রাধিকার বদলে দিয়েছে।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বৈশ্বিক উন্নয়ন অর্থায়নে কাঠামোগত পরিবর্তন শুরু হয়েছে। এ বাস্তবতায় বাংলাদেশের মতো দেশকে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ, অর্থনৈতিক সংস্কার ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্থিতিশীল বহুপক্ষীয় অর্থায়ন ব্যবস্থার পক্ষে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।

এই বৈশ্বিক সংকটের প্রভাব বাংলাদেশের নতুন উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়নেও দেখা যাচ্ছে। বিএনপি সরকারের ছয়টি একনেক সভায় অনুমোদন পাওয়া ১৭টি প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬১ হাজার ৭৭ কোটি ২৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে মাত্র তিনটি প্রকল্পে রয়েছে বৈদেশিক ঋণ বা অনুদান। এসব প্রকল্পে বৈদেশিক অর্থায়নের পরিমাণ ছয় হাজার ১৮০ কোটি ৭২ লাখ টাকা, যা মোট প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় ১০ শতাংশ। বাকি ৫৪ হাজার ৭৫২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে দেওয়ার কথা।

১৭টি নতুন প্রকল্পের মধ্যে ১৪টিতেই কোনো বৈদেশিক ঋণ বা অনুদান নেই। ফেনীর মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, করতোয়া নদী উন্নয়ন, মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র উন্নীতকরণ, সীমান্ত সড়ক, পশ্চিমাঞ্চলের রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণ, সচিবালয়ে নতুন ভবন, বৃহত্তর দিনাজপুরের সমন্বিত উন্নয়ন এবং পল্লী সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ ও কর্মসংস্থানের মতো প্রকল্পের অর্থায়ন প্রায় পুরোপুরিই সরকারের নিজস্ব অর্থ থেকে আসবে।

এই বাস্তবতায় ইআরডির কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশের জন্য শুধু নতুন ঋণ সংগ্রহ করাই যথেষ্ট নয়। কোন শর্তে ঋণ নেওয়া হচ্ছে, তা কোন প্রকল্পে ব্যবহার হচ্ছে, প্রকল্প থেকে কত দ্রুত অর্থনৈতিক সুফল আসবে এবং ভবিষ্যতে সেই ঋণ কিভাবে পরিশোধ করা হবে—এসব বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

খবরটি শেয়ার করতে নিচের বোতামগুলিতে ক্লিক করুন।

আরও খবর

বিভাগীয় সংবাদ