সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬ ১:৩৯ পূর্বাহ্ণ
■ ৩রা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

টাকা দিয়েও দোকান পাচ্ছেন না ছয় হাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Print

নিউজ ডেস্ক,বিডিমিরর সেভেনটিওয়ান ডটকমঃ

অন্তত ছয় হাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও হকারের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা জমা নিলেও দোকান বুঝিয়ে দিতে পারেনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মার্কেট বানিয়ে দোকান তৈরি করে দেওয়ার কথা বলে এই বিপুল টাকা নেওয়া হয়।

লটারির মাধ্যমে বরাদ্দ দেওয়া হলেও এসব দোকানে তারা কবে থেকে ব্যবসা করতে পারবে, তা সুনির্দিষ্ট করে কেউ বলতে পারছেন না। উল্টো নির্মাণসামগ্রীর দাম বাড়ার কথা বলে দোকান তৈরির জন্য এখন বাড়তি টাকা আদায়ের নোটিশ দিয়েছে ডিএসসিসি।

জানা গেছে, ডিএসসিসি নানা সময়ে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ১০টি মার্কেটে দোকান বরাদ্দের বিজ্ঞপ্তি দেয়। ডিএসসিসির অনুকূলে ১ লাখ থেকে ৩ লাখ টাকার পে অর্ডার জমা দিয়ে ছয় হাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও হকার এসব মার্কেটে দোকান পেতে আবেদন করেন। পরে লটারির মাধ্যমে দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে লটারি ছাড়াই ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে অনেকে দোকান বরাদ্দ পান। এমনকি মেয়র কোটায় সংরক্ষিত ১০ শতাংশ দোকানও বরাদ্দ পান কেউ কেউ। তবে কোনো মার্কেটের কাজই যথাসময়ে শেষ করতে পারেনি ডিএসসিসি।

চানখাঁরপুল মার্কেটে দোকান বরাদ্দ পাওয়া এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে সমকালকে জানান, ২০১৬ সালে চানখাঁরপুল মার্কেটে দোকান বরাদ্দের বিজ্ঞপ্তি দেয় ডিএসসিসি। তখন ৩ লাখ টাকার পে অর্ডার জমা দিয়ে লটারির মাধ্যমে একটি দোকান বরাদ্দ পান। এক বছর না যেতেই ডিএসসিসি আবার ২ লাখ টাকা জমা দেওয়ার জন্য চিঠি দেয়। তখন আরও ২ লাখ টাকার পে অর্ডার জমা দেন তিনি। তখন দোকানের দাম ধরা হয় ১০ লাখ টাকা। সম্প্রতি আবার ২ লাখ টাকা জমা দেওয়ার নোটিশ দেয় ডিএসসিসি। তখন বলা হয়, আপনার দোকানের মূল্য ১০ লাখ টাকার স্থলে ১২ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

ভুক্তভোগীরা জানান, চানখাঁরপুল মার্কেট ২০২০ সালের মধ্যে শেষ করে বরাদ্দপ্রাপ্তদের দোকান বুঝিয়ে দেওয়ার কথা বলেছিল ডিএসসিসি। ওই সময়ের পর আরও প্রায় ছয় বছর পার হয়ে গেছে। সরেজমিন দেখা যায়, চানখাঁরপুল মোড়ের ১২তলা মার্কেটের পাঁচতলা পর্যন্ত অবকাঠামো তৈরি হয়েছে। বর্তমানে কাজ বন্ধ। টিনের বেড়া দিয়ে ভবনটি ঘেরা।

প্রায় একই অভিযোগ করেন ইসলামবাগ মার্কেট-কাম আধুনিক নগর বিপণি বিতানের দোকান বরাদ্দপ্রাপ্ত আরেক ভুক্তভোগী। তিনি বলেন, ২০১৪ সালে ২ লাখ টাকা পে অর্ডার দিয়ে পুনর্বাসন কোটায় আমি একটি দোকান পেয়েছিলাম। ইতোমধ্যে পুরো টাকা পরিশোধ করেছি। তবে দোকান এখনও বুঝে পাইনি। অথচ ২০১৭ সালে দোকান বুঝিয়ে দেওয়ার কথা ছিল।

ডিএসসিসি জানিয়েছে, ওই মার্কেটের কাজ শেষ পর্যায়ে। মাসছয়েকের মধ্যে বাকি কাজ শেষ করে দোকান বুঝিয়ে দেওয়া হবে।

দোকান নির্মাণের সঙ্গে সম্পৃক্ত ডিএসসিসির প্রকৌশল শাখা বলছে, অর্থ বরাদ্দ সাপেক্ষে যে কোনো উন্নয়নকাজ করা হয়। যখন যে মার্কেটের বিপরীতে অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেছে, সে অনুপাতে কাজ করা হয়েছে।

জানা গেছে, কাঁঠালবাগান কাঁচাবাজার মার্কেটের বিপরীতে টাকা নেওয়া হয়েছে ১০৯ জনের কাছ থেকে। বঙ্গবাজার পাইকারি বিপণি বিতানে টাকা দিয়েছেন ২ হাজার ৯৬১ জন; বঙ্গবন্ধু হকার্স মার্কেটে ৪৫৮, গুলিস্তান ট্রেড সেন্টারে ১ হাজার ৬৪৬, পরীবাগ নগর বাণিজ্যিক কেন্দ্রে ৩০, ঢাকেশ্বরী রোড সাইড মার্কেটে ১০৯, ইসলামবাগ কাঁচাবাজারে ১৭১, চানখাঁরপুল মার্কেটে ২৭৯ এবং কাপ্তানবাজার কিচেন মার্কেটে ৮৪২ জন টাকা দিয়েছেন। তাদের কেউ এখনও দোকান বুঝে পাননি।

দোকানের দাম আকাশছোঁয়া
একসময় সিটি করপোরেশনের দোকান ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছে লোভনীয় ছিল। কিন্তু কয়েক বছরে দোকানের দাম ব্যাপক হারে বাড়িয়েছে ডিএসসিসি। যেখানে সরকার নির্ধারিত প্রতি বর্গফুটের বর্তমান নির্মাণ খরচ দুই হাজার ৫০০ টাকা। সেখানে ডিএসসিসি প্রতি বর্গফুটের দাম নির্ধারণ করছে এর চেয়ে অনেক বেশি।

ডিএসসিসির নথিতে দেখা গেছে, প্রতি বর্গফুটের সর্বনিম্ন মূল্য ৬ হাজার ৫০০ টাকা। আর সর্বোচ্চ দাম ধরা হয়েছে ২৪ হাজার টাকা। দোকানের তলা ও অবস্থান অনুযায়ী এই দামের পার্থক্য নির্ধারণ করেছে সংস্থাটি। দেখা গেছে, বঙ্গবাজারে প্রতি বর্গফুটের দাম ১১ হাজার থেকে ২২ হাজার ৫০০ টাকা। বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ হকার্স মার্কেটে ৭ হাজার থেকে ২৪ হাজার টাকা। ঢাকেশ্বরী রোড সাইড মার্কেটে ১৪ হাজার ৮০০ টাকা। ইসলামবাগ কাঁচাবাজারে ১২ হাজার থেকে ২১ হাজার টাকা। ইসলামবাগ আধুনিক নগর বিপণি বিতানে ১৬ হাজার থেকে ১৮ হাজার টাকা। চানখাঁরপুল কমপ্লেক্স মার্কেটে ৭ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা। কাপ্তানবাজার কিচেন মার্কেটে ৭ হাজার থেকে ৮ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারিত আছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও হকাররা বলছেন, প্রতি বর্গফুটের দাম ১০ হাজার টাকা হলেও ১০০ বর্গফুটের একটি দোকানের মূল্য দাঁড়ায় ১০ লাখ টাকা।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, এই টাকা দিলে দোকানটা যে সারাজীবনের জন্য বরাদ্দপ্রাপ্তের হয়ে যায়, তা নয়। বরাদ্দ পাওয়ার পর মাসে মাসে আবার ভাড়াও (সালামি) দিতে হয়। কিন্তু অনেক হকারের পক্ষেই এত দাম পরিশোধ করা সম্ভব হয় না। এ জন্য হকার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের নামে একের পর এক মার্কেট তৈরি হলেও প্রকৃত হকাররা সেখানে দোকান নিতে পারছেন না। প্রভাবশালীরাই এসব দোকানের মালিক হয়ে যাচ্ছেন।

বিষয়টি স্বীকার করে ডিএসসিসির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা জোনায়েদ কবির সোহাগ সমকালকে বলেন, এ ছাড়া তো বিকল্পও নেই। সিটি করপোরেশন জমির মূল্য ও নির্মাণ খরচের ওপর ভিত্তি করে দোকানের প্রতি বর্গফুটের দাম নির্ধারণ করে। এটা করপোরেশনের লাভজনক কোনো ব্যবসা না। এটা একটা সেবা।

মার্কেট নির্মাণ সেলের নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়া বলেন, আমাদের দায়িত্ব মার্কেট তৈরি করে দেওয়া। দোকান বরাদ্দ ও দাম নির্ধারণ করে রাজস্ব শাখা। এখানে প্রকৌশল শাখার করার কিছু নেই।

বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সেকান্দার হায়াৎ সমকালকে বলেন, যেভাবে সিটি করপোরেশন দোকান দেয়, তাতে প্রকৃত হকার বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা দোকান পান না। দলীয় লোক ও ঘনিষ্ঠদের সুবিধা দিতেই এসব মার্কেট বানানো হয়। যদি তারা প্রকৃত হকারদের পুনর্বাসন করতে চাইত, তাহলে একটা টোকেন অর্থ নিয়ে তাদের দোকান বুঝিয়ে দেওয়ার পর কিস্তিতে বিনা সুদে বাকি টাকাটা নিতে পারত। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, আগেই দোকানের পুরো টাকা নিয়ে নিচ্ছে। সময়মতো দোকানও বুঝিয়ে দিচ্ছে না। বছরের পর বছর হকাররা টাকা দিয়ে দোকানের জন্য ঘুরছে।

খবরটি শেয়ার করতে নিচের বোতামগুলিতে ক্লিক করুন।

আরও খবর

বিভাগীয় সংবাদ