শহীদুল্লাহ ফরায়জী:
সমপ্রতি অনুষ্ঠিত ‘গণমাধ্যম সম্মিলন ২০২৬’-এর প্রধান সুর ছিল সাংবাদিকদের ঐক্য। কিন্তু নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এই ঐক্যের ডাক মূলত আক্রান্ত হওয়া থেকে বাঁচার তাগিদ। যখন সাংবাদিকরা বিভিন্ন দিক থেকে চাপ, বর্বরোচিত ও মধ্যযুগীয় হামলার শিকার হচ্ছেন, তখন নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে তারা একজোট হওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন।
সম্মিলনের আলোচনায় সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিটি জোরালো হলেও, ‘সত্য বলার শক্তি’ অর্জনের বিষয়টি ছিল অনুপস্থিত।
এখানে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার উদ্দেশ্য-শারীরিক ও আইনি সুরক্ষা পাওয়া; একযোগে নির্ভীকভাবে সত্য প্রকাশ করার জন্য নয়। সত্যের শক্তিতে যে-সাংবাদিকতা বলীয়ান, তার জন্য আলাদা করে সুরক্ষার প্রয়োজন হয় না, জনগণই তার সুরক্ষা নিশ্চিত করে। কিন্তু যখন সত্য বলা গৌণ হয়ে যায় এবং কেবল নিজেদের টিকে থাকাটাই মুখ্য হয়, তখন সেই ঐক্য কেবল একটি স্বার্থরক্ষার গোষ্ঠীতে পরিণত হয়। আমাদের প্রয়োজন সত্য বলার হিম্মত অর্জনের জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়া; কেবল মার খাওয়া থেকে বাঁচার জন্য নয়।
সাংবাদিকতার ইতিহাসে দেখা গেছে, যখন গণমাধ্যম কোনো বড় দুর্নীতির বিরুদ্ধে বা জনস্বার্থে একযোগে সত্য প্রচার করেছে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে তখন কোনো অপশক্তিই তাদের দমাতে পারেনি। বর্তমানের এই ‘বাঁচার জন্য ঐক্য’ আসলে একটি সাময়িক ঢাল মাত্র। যদি সাংবাদিকরা সম্মিলিতভাবে সত্য প্রকাশের সাহস হারান, তবে কেবলই ঐক্যবদ্ধ হয়ে তারা নিজেদের রক্ষা করতে পারবেন না।
গণমাধ্যম সম্মিলনের আহ্বান সফল হবে তখনই, যখন এই ঐক্য কেবল ‘হামলা থেকে বাঁচতে’ সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং ‘সত্য বলার সম্মিলিত হিম্মত’ তৈরিতে ভূমিকা রাখবে। সত্য প্রকাশই হোক ঐক্যের প্রধান ভিত্তি, শুধুই আত্মরক্ষা নয়।
বাংলাদেশের গণমাধ্যম কখনো স্বকীয় সত্তায় দাঁড়িয়ে-স্বাধীনতা, গণতন্ত্র কিংবা আপসহীন সত্যের বাতিঘর হতে পারেনি। যে প্রতিষ্ঠানের হওয়ার কথা ছিল- জন-আকাঙ্ক্ষার দর্পণ এবং রাষ্ট্রীয় দস্যুতার বিরুদ্ধে এক অতন্দ্র প্রহরী, বিদ্যমান বাস্তবতায় তার ঐতিহাসিক ভূমিকা আজ চরম লাঞ্ছনার শিকার। আজকের এই সন্ধিক্ষণে বারবার উন্মোচিত হচ্ছে এক নগ্ন সত্য-আমাদের গণমাধ্যম সত্যের দায়ভার বহন করার তেজ হারিয়ে ক্ষমতার ‘পার্শ্বচর’ বা ‘সুবিধাসঙ্গী’ হিসেবেই নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে।
বড় ও প্রভাবশালী অনেক গণমাধ্যম বারবার নিজেদের অবস্থান বদলিয়েছে। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে-ভাষা, অবস্থান ও নৈতিকতার সংজ্ঞাও বদলিয়েছে। স্বাধীনতার আদর্শ ও সত্য প্রকাশের দায় থেকে সরে এসে তারা কখনো দলীয় গুণগানে, কখনো বা রাষ্ট্রের ভাষ্য পুনরুৎপাদনে ব্যস্ত থেকেছে। ফলে সত্যিকারের প্রশ্ন তোলা ক্রমেই অনুপস্থিত হয়েছে, আর গণমাধ্যমের রাজনৈতিক ও নৈতিক সংকট আরও গভীর হয়েছে।
গণমাধ্যম যখন রাষ্ট্রের কাঠামোগত অন্যায় কিংবা শাসকের ব্যর্থতাকে ‘উন্নয়ন’ বা ‘স্থিতিশীলতার’ মোড়কে প্রচার করে, তখন তারা জনগণের কণ্ঠস্বর থাকে না; বরং হয়ে ওঠে শোষকের রক্ষাকবচ। এটি জনস্বার্থের মোড়কে জনস্বার্থের ওপর চালানো এক জঘন্যতম প্রতারণা। সবচেয়ে ভয়াবহ হলো-এই পেশার নৈতিক ধস এবং দায়গ্রহণের অনীহা। ভুল তথ্য, একপক্ষীয় প্রোপাগান্ডা কিংবা বিভ্রান্তিকর বয়ান ছড়িয়ে দেয়ার পর, আমাদের গণমাধ্যমের প্রাতিষ্ঠানিক কোনো অনুশোচনা বা সংশোধনী দেখা যায় না। ক্ষমতার দমন-পীড়নকে আড়াল করতে এরা অত্যন্ত নিপুণভাবে সত্যকে খণ্ডিত করে অথবা গল্পের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্মিত আষাঢ়েগল্প এবং গোয়েন্দা সংস্থার সরবরাহকৃত তথ্যকে কোনো যাচাই ছাড়াই পরম সত্য হিসেবে প্রচার করে। এতে গণমাধ্যম সমাজের ‘ওয়াচডগ’ হওয়ার মর্যাদা হারিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের একটি ‘এক্সটেন্ডেড উইং’ বা ‘সমপ্রসারিত অঙ্গ’ হিসেবে পরিণত হয়। সংবাদ তখন আর তথ্যের আদান-প্রদান থাকে না; হয়ে ওঠে ক্ষমতার অট্টহাসির প্রতিধ্বনি।
সবচেয়ে বড় পরিহাস হলো, যে-গণমাধ্যমগুলো দীর্ঘকাল নিজের মেরুদণ্ড বন্ধক রেখেছিল, আজ তারা কোনো আত্মপক্ষ সমর্থন বা কৈফিয়ত ছাড়াই রাতারাতি ‘বিবেকের কণ্ঠস্বর’ সেজে মঞ্চে অবতীর্ণ হয়েছে। এটি কেবল সাংবাদিকতার অবক্ষয় নয়, বরং ইতিহাসের সঙ্গে চতুর এক জালিয়াতি। মনে রাখা প্রয়োজন, ‘বিবেক’ কোনো ঋতুভিত্তিক ফ্যাশন নয় যে, প্রয়োজনে পরা যাবে আর অপ্রয়োজনে খুলে রাখা যাবে।
সাংবাদিকরা যদি নিজেদের অতীত পাপ এবং পক্ষপাতের দিকে ফিরে না তাকান, তবে তাদের মুখে স্বাধীনতার বুলি কেবল একটি আবছা মুখোশ। আত্মসমালোচনা ছাড়া সত্যের সন্ধান অসম্ভব। আত্মজিজ্ঞাসাহীন এই নৈতিকপঙ্গুত্ব শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, বরং ভয়াবহ সামাজিক বিপর্যয়ের এক ইঙ্গিত- যেখানে সত্যের চেয়ে সুবিধাই বড় ধর্ম।
যে-গণমাধ্যমগুলো নিজের ভ্রান্তি স্বীকার করতে ভয় পায়, তারা জনগণের আস্থা হারায় চিরতরে। তখন তারা আর সত্যের প্রতিষ্ঠান থাকে না; পরিণত হয় বিশেষ এজেন্ডা বাস্তবায়নের রাজনৈতিক হাতিয়ারে। বর্তমানের অজুহাত দিয়ে অতীতের নির্লজ্জ দাসত্বকে জায়েজ করা যায় না। ইতিহাসের সাক্ষ্য ছাড়া কোনো সত্য টিকে থাকে না। যদি গণমাধ্যম অতীতের নির্লজ্জ দালালি ভুলে গিয়ে বর্তমানে সাধু সাজতে চায়, তবে তাদের সেই স্বাধীনতার দাবি অত্যন্ত ফাঁপা ও অর্থহীন। যারা সত্যকে দাফন করে সরকারের প্রেস নোট ছেপেছে, তারা ইতিহাসে সত্যের বাহক হিসেবে নয়, বরং ক্ষমতার ‘পার্শ্বচর’ হিসেবেই চিহ্নিত হবে। মনে রাখতে হবে, দায়বদ্ধতাহীন নৈতিকতা একটি অলীক কল্পনা। দায় এবং ইতিহাসের সাক্ষ্য ছাড়া গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কেবল একটি ফাঁকা শব্দবন্ধ, যার সঙ্গে বাস্তবের কোনো সংযোগ নেই।
লেখক: গীতিকবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
faraizees@gmail.com







